Web Analytics Made Easy - StatCounter

আরব কন্যার আর্তনাদ পৃষ্ঠা-০৩

আজ থেকে এক হাজার চারশ বছর আগে রাসূল (ﷺ) তায়েফ শহর অবরােধ করেছিলেন। তায়েফবাসীদের জীবনপণ মােকাবিলার কারণে শেষ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনীকে অবরােধ প্রত্যাহার করে ফিরে আসতে হয়েছিল।

আল্লাহ্ তাআলা সেই অবরােধের চৌষট্টি বছর পর তায়েফকে এমন এক সৌভাগ্যে উদ্ভাসিত করলেন যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল মাইল ফলক হয়ে থাকবে। আর সেই সৌভাগ্যের প্রথম মাইল ফলক ছিল বনী ছাকিফ গােত্রের বীর পুরুষ মালিক বিন আউফের ইসলাম গ্রহণ।

৬৯ হিজরী সনের ঘটনা। তায়েফের অধিবাসী এক তরুণীবধু সন্তান সম্ভবা হলেন। তরুণীর স্বামী ইসলামী সালতানাতের একজন তুখােড় সৈনিক। সেনাবাহিনীতে সে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত। ছুটির অবসরে সেই সেনা বাড়িতে এলে স্ত্রী লাজনম্রকন্ঠে স্বামীকে জানালাে অন্তঃসত্তা সে। অনাগত সন্তানের চেহারা দেখার আশায় সে বুক বেঁধে রয়েছে। সেই সাথে স্ত্রী এও জানালাে, ভয়ংকর একটি স্বপ্ন দেখে সে ভীত হয়ে পড়েছে। তার স্বপ্নময় প্রত্যাশার আশপাশে উঁকি দিচ্ছে কতগুলাে ভীতিকর ভূতুড়ে শঙ্কা।

তরুণী স্বামীকে জানালাে- আমি স্বপ্নে দেখেছি হঠাৎ আমার ঘরটি ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেছে, এমন ঘন অন্ধকার যে, আমি নিজের হাত-পা পর্যন্ত দেখতে পারছিলাম না। ভয়ে আতঙ্কে আমি জড়সড় হয়ে গেলাম। আমার ভয় হচ্ছিলাে ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু কি হচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমি ঘরে একা ছিলাম। খুব জোরে চিৎকার করে কাউকে ডাকতে চাচ্ছিলাম; কিন্তু আমার মুখ থেকে একটুও শব্দ বের হচ্ছিলাে না। মনে করছিলাম ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে যাই, কিন্তু তাও পারছিলাম না। শত চেষ্টা করেও আমার পা এক কদমও উঠাতে পারছিলাম না। গভীরভাবে ব্যাপারটি ভাবতে চেষ্টা করি কিন্তু সব চিন্তা-ভাবনাই কেমন যেন এলােমেলাে হয়ে যাচ্ছিল। কোন কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না…।

কিন্তু মনে মনে আল্লাহ্ আল্লাহ্ করছিলাম। আর নানা দোয়া-কালাম পাঠ করছিলাম। এতােটুকু বােধ আমার অক্ষুন্ন ছিল। এমন সময় দূর আকাশের এক কোণে একটি তারা দেখা দিলাে, তারাটি প্রথমে আবছা আলাে আঁধারে অস্পষ্ট ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারাটি ঝকমকে দীপ্তিমান হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে আসমানের তারাটি আমার দিকে নেমে এলাে। আঁধার ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। দেখতে দেখতে আলােকিত তারাটি আমার ঘরে এসে পড়ল, এতে আমার ঘরটি আলােয় ভরে গেল। এ যেন জমিনের কোন আলাে নয়, অন্য রকম আসমানী নূর। এ আলােয় আমার ভয় ভীতি সব দূর হয়ে গেল। মনটা এক ধরনের প্রশান্তিতে ভরে গেল। ঠিক এ সময়ই আমার ঘুম ভেঙে গেল।”

“মন্দ কোন স্বপ্ন দেখােনি। মনে তাে হয় ভালােই দেখেছে” বলল তরুণীর সৈনিক স্বামী।

“কিন্তু অন্ধকারটা কি দেখলাম?” অন্ধকারটার কথা মনে হলে আমার কেমন যেন ভয় লাগে। আচ্ছা, তুমি কি এমন কোন আলেম চেনাে যে স্বপ্নের তা’বীর ভালাে বলতে পারে?”

“ভাগ্যে যা লেখা রয়েছে তা কেউ বদলাতে পারে না। স্বপ্নের তা’বীর যদি ভালাে না হয়, তা কি তুমি বদলাতে পারবে?” বলল স্বামী।

“মন্দের কথা মুখে এনাে না। আমার বিশ্বাস ভালােই হবে। আগে তুমি জিজ্ঞেস তাে করবে? জিজ্ঞেস না করে নিজে নিজেই কেন ব্যাখ্যা দিচ্ছাে? স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য এ সেনা অফিসারের যুবতী স্ত্রী স্বামীর কাছে জিদ ধরল। স্ত্রীর সন্তুষ্টি বিধানে অবশেষে সৈনিক স্বামী তায়েফের সমকালীন শ্রেষ্ট বুযুর্গ ইসহাক বিন মূসার শরণাপন্ন হলাে। ইসহাক বিন মূসার কাছে ব্যক্ত করল স্ত্রীর স্বপ্নের আদি অন্ত। ইসহাক বিন মূসা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি স্বপ্নের বর্ণনা শুনে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।

অনেকক্ষণ নীরবে বসে থাকতে দেখে অনাগত সন্তানের সৈনিক পিতা “বলুন ইবনে মূসা। স্বপ্নের ব্যাখ্যা যদি মন্দও হয়, তবুও আমাকে বলুন। তাতে আমি ঘাবড়ে যাবাে না।”

“না না। তা’বীর মােটেও মন্দ নয়” বললেন ইসহাক বিন মূসা। তােমার স্ত্রীর গর্ভে এমন এক ছেলে জন্ম নেবে আকাশের উজ্জ্বল তারকার মতাে যার দ্যুতি সারা জগতে ছড়িয়ে পড়বে। সে আল্লাহর দ্বীনের আলাে দুনিয়ার দিকে দিকে বহু জনপদে ছড়িয়ে দেবে। শত শত বছর পরের লােকজনও তার কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তার নির্দেশে মুসলিম যােদ্ধারা বহু দূর পর্যন্ত ইসলামের বিজয় কেতন উড়িয়ে দেবে। কিন্তু…!”

ইসহাক কথা শেষ না করেই নীরব হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে তিনি কোন কথা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে চান।

“আল্লাহর কসম! ইবনে মূসা! আপনার এই থেমে যাওয়া খুবই রহস্যজনক। আমি যে কোন মন্দ খবরও শুনতে প্রস্তুত। আপনি নির্দ্বিধায় বলুন। আমাকে সংশয়ের মধ্যে না ফেলে আপনি যা বুঝতে পেরেছেন তা সরাসরি বলুন।”

“তাহলে শােন! যে তারকা সদৃশ সন্তান তােমার ঘর আলােকিত করবে, সে এমন তারকাদের অন্তর্ভুক্ত যেসব তারকা অল্প সময়ের মধ্যে হারিয়ে যায়, খসে পড়ে। অবশ্য দৃশ্যত এসব তারকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও এদের আলাে থাকে দীর্ঘ সময়। এ সন্তান তােমার ঘরে বেশীদিন না থাকলেও তােমার ঘর অন্ধকার হবে না। মানুষের মনে সে জীবিত থাকবে অনন্তকাল। তােমার ঘর আলােকিত থাকবে সারাজীবন। মানুষ মনমুকুরে তার স্মৃতি ধরে রাখবে, তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।”

“তাহলে আমিও তাকে এমনভাবে লালন-পালন করবাে, যাতে সে ইসলামের উজ্জ্বল তারকা হিসাবে নিজেকে আলােকিত করতে পারে।” বলল ভাবী সন্তানের পিতা।

“একথাও তােমার জেনে রাখা দরকার, এ সন্তানের লালন-পালনের সুযােগ তােমার হবে না, সে বড় হবে তােমার স্ত্রীর আদর-সােহাগে।”

কেন? আমি তাকে লালন-পালন করতে পারবাে না কেন?

“সে কথা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমার যা বলার ছিল আমি বলে দিয়েছি” বললেন ইসহাক বিন মূসা।

ভাবী সন্তানের সৈনিক পিতা ইসহাক বিন মূসার দরবার ত্যাগ করে স্ত্রীর কাছে ইসহাকের দেয়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা সবিস্তারে ব্যক্ত করল।

স্ত্রী স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে অজানা আশাবাদে উৎফুল্ল হলাে বটে, কিন্তু সন্তানের হায়াত কম হবে ভেবে দুশ্চিন্তায় ডুবে গেল।

সন্তান প্রসবের দিনক্ষণ যখন ঘনিয়ে এলাে, তখন ভাবী সন্তানের সৈনিক পিতাকে সরকারীভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক যুদ্ধে অনেক দূরে পাঠিয়ে দেয়া হলাে। সেই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করল সে। পিতার মৃত্যুতে ইসহাক বিন মূসার আশঙ্কাই বাস্তবরূপ লাভ করল যে, ভাবী সন্তানকে তার পিতা লালন-পালন করার সুযােগ পাবে না। পরবর্তীতে ইসহাক বিন মূসা এ ঘটনার ব্যাখ্যায় বলেন, ভাবী সন্তানের মা স্বপ্নের প্রথমে যে অন্ধকার দেখেছিল, তা ছিল ভাবী সন্তানের পিতা ও তার স্বামীর মৃত্যুজনিত অন্ধকার, যে অন্ধকারে আলােকবর্তিকা হয়ে ঘর আলােকিত করবে এ সন্তান।

<<পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা-০২    পরবর্তী পৃষ্ঠা-০৪ >>

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + four =

error: Content is protected !!