ইমান ও নিফাক⸺ক্রমেই আলাদা হচ্ছে দুটি শিবির :

ফিতনার অমানিশা আরও প্রগাঢ় হচ্ছে। দীনের স্বীকৃত দূর্গগুলো ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়ছে। সময় নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। দূর থেকে অশ্বারোহীদের পদাঘাত শোনা যাচ্ছে। সময়টি অত্যন্ত নাজুক। অবস্থা খুবই সংকটময়। সামান্য ভুল বা অসতর্কতায় ইমান বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। অজান্তেই ঘটতে পারে নিফাকের অনুপ্রবেশ। দুনিয়ার কত কিছুর জন্যই তো আমরা নিখুঁত প্ল্যান ও প্রচেষ্টা করে থাকি, কিন্তু ইমানের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের হিফাজতের জন্য কি আমাদের এমন নিখাঁদ প্রচেষ্টা জারি আছে? এ দুর্যোগপূর্ণ ক্ষণে আমার করণীয় কী, তা কি কখনও ভেবে দেখেছি? নাকি সময়ের গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে ভাবছি, সময় আসুক, তখন দেখা যাবে? প্রস্তুতিহীন থাকার মজা তখনই বুঝে আসবে, যখন ভয়ংকর সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।বর্তমানে যে ফিতনাগুলো দেখছি, তা আমাদের পুরোপুরি অজ্ঞাত ছিল না। হাদিসে এসব ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যথেষ্ট ইঙ্গিত আছে। কিন্তু এত তাড়াতাড়িই যে শুরু হয়ে যাবে, তা কখনও ভাবিনি। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত যত ফিতনার আবির্ভাব হয়েছে, একবিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশেই তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ফিতনার আবির্ভাব ঘটেছে। আর ফিতনাগুলোও এমন যে, একটির চেয়ে অপরটি অধিক ভয়ংকর। একসময় যে ফিতনার কল্পনা ছিল সুদূরপরাহত, এখন তা হয়ে গেছে একেবারে পানিভাতের মতো। অসচেতনরা তো বটেই, বর্তমানে যারা নিজেদের সচেতন ভাবেন, তারাও এসব থেকে খুব বেশি বাঁচতে পারছেন না। নতুন শতাব্দী আমাদের সামনে যেমন ভয়ংকর অন্ধকারাচ্ছন্ন এ পরিস্থিতি উন্মোচন করে দিয়েছে, পাশাপাশি সুখের খবর এটাই যে, এর পিছনে সূর্যের কিরণও কিছুটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। নিশ্চয়ই প্রত্যেক অন্ধকারের পরই আলো আসে।

একটি সহিহ হাদিসের ভাষ্য হলো, ‘আল্লাহ এ উম্মতের জন্য প্রতি একশ বছরের শিরোভাগে এমন একজনকে পাঠাবেন, যিনি উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে সঞ্জীবিত করবেন।’ (সুনানু আবি দাউদ : ৪২৯১) ইতিহাস দেখলেও প্রতীয়মান হয় যে, প্রায় প্রতিটি আন্দোলন বা বিপ্লবই একশ বছর পর্যন্ত স্বমহিমায় বিদ্যমান ও কার্যকর থাকে। এরপর হয় তা বিলীন হয়ে যায়, নয়ত নিস্তেজ হয়ে পড়ে। আমাদের যুগেও এর নজির বিদ্যমান রয়েছে। সামনের যে যুগসন্ধিক্ষণ আসছে, তাতে অনেকেরই আশা যে, এ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ তিনিই হবেন, যার প্রতীক্ষায় উম্মাহ দীর্ঘকাল অপেক্ষায় আছে। বিভিন্ন ইশারা-ইঙ্গিত সে আশাকে আরও সুদৃঢ় করে তুলছে। আল্লাহই ভালো জানেন।

সামনে যে ইমান ও নিফাকের শিবিরে মানুষ দুভাগে বিভক্ত হবে, তার সূচনা এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে। ক্রমেই মানুষ নির্দিষ্ট শিবিরে গিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। আর আমরা আশা করছি, অচিরেই সব স্পষ্ট হয়ে যাবে, কারা কোন তাবুর, কারা কোন শিবিরের। একপক্ষে থাকবে গুরাবা, আরেক পক্ষে থাকবে জমহুর। বেশিরভাগ লোক দেখে অধিকাংশ মানুষই ধোঁকা খেয়ে বসবে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে নিজের ইমান ও আখিরাতকে হুমকির মুখে নিয়ে ফেলবে। ফিতনার ভয়াবহতা এতটাই প্রকট হবে যে, এ ফিতনার চপেটাঘাত থেকে কেউই বাঁচতে পারবে না। এ ব্যাপারে হাদিসের ভাষ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। সুনানে আবু দাউদে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :

‘আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট বসা ছিলাম। তিনি ফিতনা সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করলেন; এমনকি তিনি আহলাস ফিতনা সম্পর্কেও বললেন। তখন একজন বলল, আহলাস ফেতনা কী? তিনি বললেন, পলায়ন ও লুটতরাজ। অতঃপর একটি ফিতনা আসবে, যা হবে আনন্দদায়ক। আমার পরিবারের জনৈক ব্যক্তির দু’পায়ের নিচ থেকে এর অন্ধকারাচ্ছন্ন ধোঁয়া বের হবে। সে ধারণা করবে যে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত; অথচ সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, আমার বন্ধু হচ্ছে আল্লাহভীরু ব্যক্তিগণ। তারপর জনগণ এমন এক ব্যক্তির অধীনে একতাবদ্ধ হবে, যেন সে পাঁজরের ওপর কোমরের হাড় সদৃশ। অতঃপর তিনি দুহাইমা বা ঘন অন্ধকারময় ফিতনা প্রসঙ্গে বললেন। সে ফিতনা এই উম্মতের প্রত্যেককেই একটি চপেটাঘাত না করে ছাড়বে না। অতঃপর যখন বলা হবে যে, তা শেষ হয়ে গেছে, তখন তা আরও প্রসারিত হবে। এ সময় যে লোকটি সকালে মুমিন ছিল, সন্ধ্যা হতে না হতেই সে কাফির হয়ে যাবে। অবশেষে সব মানুষ দুটি শিবিরে বিভক্ত হবে। একটি হবে ইমানের শিবির, যেখানে কোনো নিফাক থাকবে না। আর অন্যটি হবে নিফাকের শিবির, যেখানে কোনো ইমান থাকবে না। যখন তোমাদের এ অবস্থা হবে, তখন দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের অপেক্ষা করবে,ওইদিন বা তার পরের দিন থেকে।’ (সুনানু আবি দাউদ : ৪২৪২)

খুব ভয় হচ্ছে। আশঙ্কা দিনদিন বেড়েই চলছে। এ ভয়ানক পরিস্থিতিতে উম্মাহর করুণ হালত দেখে খুব কান্না পায়, অনেক কষ্ট লাগে। কিন্তু কিচ্ছু যে করার নেই! অসহায় আমরা!! নিজের ইমান বাঁচানোর ফিকির আগে। সবাই নিজ সাধ্যানুসারে ইমান বাঁচানোর ফিকির করি, নিফাক থেকে দূরে থাকি। সময়ের ভয়াবহতা এতই বেশি, যা বলে বুঝাতে পারব না। হে আল্লাহ, আমাদের চলার পথ যেন ইমানের শিবিরে গিয়ে পৌঁছে, নিফাকের শিবির থেকে যোজন যোজন দূরে থাকে।

ইয়া নাফসি! ইয়া নাফসি!! ইয়া নাফসি!!!

(ফিতনার এ ভয়ংকর সময়ে অলস বসে থাকার মতো বোকামি আর কিছু হতে পারে না। সময়টি এতই নাজুক যে, সত্য-মিথ্যা, সাদা-কালো মিশে সব একাকার হয়ে যাচ্ছে। এ অন্ধকারাচ্ছন্ন মুহূর্তে কুরআন-সুন্নাহর অধ্যায়ন থেকে যত দূরে থাকবেন, অন্ধকার আপনাকে গ্রাস করে নেওয়ার আশঙ্কা তত বেশি থাকবে। তাই এখন সময় নষ্ট করার আর অবকাশ নেই। ইমান-নিফাক ও ফিতনা বিষয়ক পড়াশোনা শুরু করে দিন। কোথা থেকে কীভাবে পড়বেন, সেটা আপনার পরিচিত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য আলিম থেকে জেনে নিন; এর জন্য যতই কষ্ট করা লাগুক না কেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করেছেন, সেসব বিষয়ে এখন থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। সম্ভবত সামনে আর একেবারে সময় পাওয়া যাবে না। আল্লাহই ভালো জানেন। আল্লাহ আমাদের সকল ফিতনা থেকে দূরে রেখে সঠিক পথে ও গুরাবার সাথে থাকার তাওফিক দান করুন।)

🖊 মুফতি তারেকুজ্জামান দা.বা.

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × one =

error: Content is protected !!