Web Analytics Made Easy - StatCounter

খতমে তারাবিহ ও দ্রুত তিলাওয়াত : প্রমাণ ও বিধান

বর্তমানে কিছু ভাইকে দেখা যায়, তারা খতমে তারাবিহকে বিদআত বলেন এবং তারাবিহ’র সালাতে হদরের সহিত একটু দ্রুত কিরাআত পড়াকে খুবই বাঁকা চোখে দেখে থাকেন। অনেকে এর খুব সমালোচনাও করে থাকেন। তবে অতিরিক্ত দ্রুততা হলে (যেমনটা আমাদের দেশে সাধারণত হয়ে থাকে) সেটা অবশ্যই নিন্দনীয় ও বর্জনীয়। আমাদের জানার বিষয় হলো, আসলেই কি খতমে তারাবিহ বিদআত? সত্যিই কি তারাবিহ’র সালাতে কিরাআত একটু দ্রুততার সহিত পড়া যাবে না? সব দ্রুততাই কি নিন্দনীয়? আসুন বিষয় দুটি হাদিস ও আসারের আলোকে যাচাই করে নিই।হাদিস, আসারে সাহাবা ও আসারে তাবিয়িন থেকে তারাবিহ’র সালাতে কুরআন খতম করার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ একাধিক প্রমাণ পাওয়া যায়। আর তারাবিহতে কুরআন খতমের ক্ষেত্রে ধীর, মধ্যম ও দ্রুত⸺তিন ধরনের কিরাআত পড়ারই প্রমাণ পাওয়া যায়। নিম্নে আমরা এসংক্রান্ত কয়েকটি বিশুদ্ধ হাদিস ও আসার উল্লেখ করছি।সুনানে বাইহাকিতে হাসান (উত্তম) সনদে বর্ণিত হয়েছে :
أنبأ أَبُو زَكَرِيَّا بْنُ أَبِي إِسْحَاقَ وَأَبُو بَكْرٍ أَحْمَدُ بْنُ الْحَسَنِ الْقَاضِي وَأَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ السُّلَمِيُّ قَالُوا: ثنا أَبُو الْعَبَّاسِ مُحَمَّدُ بْنُ يَعْقُوبَ أنبأ بَحْرُ بْنُ نَصْرٍ قَالَ: قُرِئَ عَلَى عَبْدِ اللهِ بْنِ وَهْبٍ أَخْبَرَكَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ سَلْمَانَ وَبَكْرُ بْنُ مُضَرَ عَنِ ابْنِ الْهَادِ أَنَّ ثَعْلَبَةَ بْنَ أَبِي مَالِكٍ الْقُرَظِيَّ حَدَّثَهُ قَالَ: خَرَجَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ فَرَأَى نَاسًا فِي نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ يُصَلُّونَ فَقَالَ: مَا يَصْنَعُ هَؤُلَاءِ؟ قَالَ قَائِلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ، هَؤُلَاءِ نَاسٌ لَيْسَ مَعَهُمْ قُرْآنٌ وَأُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ يَقْرَأُ وَهُمْ مَعَهُ يُصَلُّونَ بِصَلَاتِهِ. قَالَ: قَدْ أَحْسَنُوا أوَ قَدْ أَصَابُوا. ولَمْ يَكْرَهْ ذَلِكَ لَهُمْ.
‘সালাবা বিন আবু মালিক রহ. বর্ণনা করেন যে, রমজানের একরাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের দেখতে পেলেন যে, তারা মসজিদের এককোণে (জামাআতে) সালাত পড়ছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এরা কী করছে? লোকজন বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এরা ওই সব লোক, যাদের (পূর্ণ) কুরআন ইয়াদ নেই। তাই উবাই রা. (তারাবিহ’র সালাতে) কিরাআত পড়ছেন আর তারা তাঁর সাথে মিলে জামাআতে সালাত আদায় করছে। তিনি বললেন, ভালো করেছে বা বললেন, ঠিক কাজই করেছে। এ কাজটিকে তিনি তাদের জন্য অপছন্দ করলেন না।’ (আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ২/৬৯৭ হাদিস নং ৪৬১১, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)ইমাম বাইহাকি রহ. হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন :
هَذَا مُرْسَلٌ حَسَنٌ.
‘এটি হাসান (উত্তম সনদে বর্ণিত) মুরসাল হাদিস।’ (প্রাগুক্ত)এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবেই বুঝা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেও তারাবিহ’র সালাতে কুরআন খতম করা হতো। কেননা, যারা উবাই রা.-এর পেছনে তারাবিহ পড়তেন, তারা যে কুরআন একেবারেই জানতেন না ব্যাপারটি তেমন নয়। যেহেতু সব সাহাবিই কমবেশি কুরআন মুখস্ত রাখতেন। এটা অসম্ভব একটা বিষয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবি হয়েও কুরআনের কোনো অংশ ইয়াদ করেননি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, সাহাবিদের সবাই হাফিজে কুরআন ছিলেন না। উক্ত হাদিসে ‘তাদের কুরআন ইয়াদ নেই’ কথাটির অর্থ হলো, সে সময় পর্যন্ত অবতীর্ণ পূর্ণ কুরআন তাদের ইয়াদ নেই। অর্থাৎ তারা পূর্ণ কুরআনের হাফিজ ছিলেন না। এজন্য তারাবিহ’র সালাতে পূর্ণ কুরআন শোনার উদ্দেশ্যে তাঁরা সাহাবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হাফিজে কুরআন উবাই বিন কাব রা.-এর পেছনে ইকতিদা করতেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু তা দেখে সমর্থন করেছেন, বিধায় তা মারফু হাদিসের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়ে তারাবিহ’র একটি সুন্নাত বলে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ তারাবিহ’র সালাতে কুরআন খতম করা সুন্নাত, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমর্থন দ্বারা প্রমাণিত।মোটকথা, উক্ত হাদিস থেকে প্রমাণ হলো যে, যারা হাফিজে কুরআন নয়, তারা তারাবিহ’র সালাতে কোনো হাফিজের পেছনে দাঁড়িয়ে জামাআতের সাথে পড়বে। মুহাদ্দিসগণ এ হাদিস দ্বারা হাফিজদের পেছনে জামাআতে তারাবিহ পড়ার প্রমাণ পেশ করেছেন। ইমাম বাইহাকি রহ. উক্ত হাদিসের পূর্বে শিরোনাম বেঁধেছেন এভাবে :
بَابُ مَنْ زَعَمَ أَنَّهَا بِالْجَمَاعَةِ أَفْضَلُ لِمَنْ لَا يَكُونَ حَافِظًا لِلْقُرْآنِ.
‘অধ্যায় : যারা বলে যে, তারাবিহ’র সালাত ওই সকল লোকের জন্য (কোনো হাফিজের ইমামতিতে) জামাআতে পড়া উত্তম, যারা কুরআনের হাফিজ নয়।’ (আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ২/৬৯৭ অধ্যায় নং ৫৮৮, প্রকাশনী :দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

এরপর ইমাম বাইহাকি রহ. উপরিউক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেন, যে হাদিস থেকে পরিস্কারভাবে প্রমাণ হয় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সোনালী সে যুগ থেকেই তারাবিহ’র সালাতে কুরআন খতম করার ধারাবাহিকতা চলে আসছে।

এটা স্পষ্ট যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়ে কুরআন খতম বলতে তখন যতটুকু কুরআন নাজিল হয়েছে, ততটুকুই উদ্দেশ্য। আর সে সময়ের জন্য সেটাই ছিল খতমে কুরআন। এজন্যই ইমাম বাইহাকি রহ.-সহ অনেক মুহাদ্দিস এসব হাদিসকে খতমে কুরআনের দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ধারাবাহিকতা শেষ হওয়ার পর তিনি আর কোনো রমজান পাননি। তাঁর অফাতের পর সাহাবা, তাবিয়িন ও পরবর্তী সালাফ পূর্ণ কুরআন দিয়ে তারাবিহ পড়েছেন; যেমনটি উমর রা., উবাই রা., আবু মিজলাজ রহ., হাসান বসরি রহ.-সহ প্রমুখের ফতোয়া ও আমল থেকে প্রমাণিত।

মুআত্তা মালিকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :
عَنْ مَالِكٍ عَنْ دَاوُدَ بْنِ الْحُصَيْنِ أَنَّهُ سَمِعَ الْأَعْرَجَ يَقُولُ: مَا أَدْرَكْتُ النَّاسَ إِلَّا وَهُمْ يَلْعَنُونَ الْكَفَرَةَ فِي رَمَضَانَ. قَالَ: وَكَانَ الْقَارِئُ يَقْرَأُ سُورَةَ الْبَقَرَةِ فِي ثَمَانِ رَكَعَاتٍ. فَإِذَا قَامَ بِهَا فِي اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً رَأَى النَّاسُ أَنَّهُ قَدْ خَفَّفَ.
‘আরাজ রহ. বলেন, আমি লোকদের তথা সাহাবি ও তাবিয়িদের রমজান মাসে কাফিরদের প্রতি অভিসম্পাৎ করতে দেখেছি। তিনি বলেন, হাফিজ ইমাম তারাবিহ’র প্রথম আট রাকআতেই সুরা বাকারা পড়ে ফেলতেন। এরপর যখন বারো রাকআতে দাঁড়াতেন তখন লোকজন দেখতে পেত যে, ইমাম কিরাআত সংক্ষেপ করে পড়ছে।’ (মুআত্তা মালিক : ২/১৫৯, হা. নং ৩৮১, প্রকাশনী : মুআসসাসাতু জায়িদ বিন সুলতান, আবুধাবি)

এ হাদিসটির সনদ সহিহ। কেননা, হাদিসটির দুজন বর্ণনাকারীই নির্ভরযোগ্য। আর এতে কোনো সূত্রবিচ্ছিন্নতাও নেই। এ হাদিসটির সনদের ব্যাপারে আল্লামা নিমবি রহ. বলেন :
إِسْنَادُهُ صَحِيْحٌ.
‘হাদিসটির সনদ সহিহ।’ (আসারুস সুনান : পৃ. নং ২৮৮, হাদিস নং ৭৭৬, প্রকাশনী : আল মাকতাবাতুল বুশরা, করাচি)

এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রমজানে একাধিকবার কুরআন খতম করা হতো। সুরা বাকারা হলো আড়াই পারার মতো প্রায়। সুতরাং আট রাকআতে সুরা বাকারা শেষ করলে হয় আড়াই পারা। আর পরবর্তী রাকআতগুলোতে কিরাআত অল্প করে পড়লেও প্রতিদিন বিশ রাকআত তারাবিহ নামাজে প্রায় তিন থেকে চার পারা বা আরও বেশি পড়া হয় বলে অনুমান করা যায়। এতে খতমে তারাবিহ সাব্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি এক রমজানে একাধিকবার কুরআন খতম করাও প্রমাণিত হয়।

মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাতে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :
حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ الثَّقَفِيُّ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُدَيْرٍ قَالَ: كَانَ أَبُو مِجْلَزٍ يَقُومُ بِالْحَيِّ فِي رَمَضَانَ يَخْتِمُ فِي كُلِّ سَبْعٍ.
‘ইমরান বিন হুদাইর রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু মিজলাজ রহ. রমজান মাসে নিজ এলাকায় তারাবিহ পড়াতেন। আর এতে প্রতি সাত দিনে এক খতম কুরআন পড়তেন।’ (মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ২/১৬২, হা. নং ৭৬৭৭, প্রকাশনী : মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)

অর্থাৎ তিনি রমজানে চার খতম বা আরও বেশি কুরআন পড়তেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত তাবিয়ি। আর তার এ আমলটি ছিল কল্যাণ ও সততার সাক্ষ্যপ্রাপ্ত সোনালী যুগের। তাই তার এ আমলটি পরবর্তীদের জন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ আসারটির সনদ সহিহ। কেননা, এর বর্ণনাকারী আব্দুল অহাব সাকাফি রহ. ও ইমরান বিন হুদাইর রহ. দুজনই নির্ভরযোগ্য। আর এতে কোনো সূত্রবিচ্ছিন্নতাও নেই। হাফিজে হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি রহ. আব্দুল অহাব সাকাফি রহ.-এর ব্যাপারে বলেন, ثقة অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য রাবী। (তাকরিবুত তাহজিব : পৃ. নং ৩৬৮, জীবনী নং ৪২৬১, প্রকাশনী : দারুর রশিদ, হালব) আর ইমরান বিন হুদাইর রহ.-এর ব্যাপারে তিনি বলেন, ثقهٌ ثقةٌ অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য, নির্ভরযোগ্য (অর্থাৎ অত্যধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী)। (প্রাগুক্ত : পৃ. নং ৪২৯ জীবনী নং ৫১৪৮)

মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাতে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :
حَدَّثَنَا حُسَيْنُ بْنُ عَلِيٍّ عَنْ زَائِدٍ عَنْ هِشَامٍ عَنِ الْحَسَنِ قَالَ: مَنْ أَمَّ النَّاسَ فِي رَمَضَانَ فَلْيَأْخُذْ بِهِمُ الْيُسْرَ فَإِنْ كَانَ بَطِيءَ الْقِرَاءَةِ فَلْيَخْتِمِ الْقُرْآنَ خَتْمَةً وَإِنْ كَانَ قِرَاءَتُهُ بَيْنَ ذَلِكَ فَخَتْمَةٌ وَنِصْفٌ فَإِنْ كَانَ سَرِيعَ الْقِرَاءَةِ فَمَرَّتَيْنِ.
‘হাসান বসরি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে লোকদের নিয়ে ইমামতি করে সে যেন তাদের জন্য সহজপন্থা অবলম্বন করে। সুতরাং সে যদি ধীরগতিতে পাঠকারী হয় তাহলে কুরআন একবার খতম করবে। যদি মাঝামাঝি (গতির) কিরাআত হয় তাহলে দেড় খতম করবে। আর দ্রুতগতিতে পাঠকারী হলে দুই খতম করবে।’ (মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ২/১৬৩, হা. নং ৭৬৭৯, প্রকাশনী : মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)

এ আসারটির বর্ণনাকারীরাও নির্ভরযোগ্য। আর এতে কোনো সূত্রবিচ্ছিন্নতাও নেই। অতএব, এর সনদ সহিহ।

মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :
عَنِ الثَّوْرِيِّ عَنِ الْقَاسِمِ عَنْ أَبِي عُثْمَانَ قَالَ: أَمَرَ عُمَرُ بِثَلَاثَةِ قُرَّاءٍ يَقْرَءُونَ فِي رَمَضَانَ. فَأَمَرَ أَسْرَعَهُمْ أَنْ يَقْرَأَ بِثَلَاثِينَ آيَةً وَأَمَرَ أَوْسَطَهُمْ أَنْ يَقْرَأَ بِخَمْسٍ وَعِشْرِينَ وَأَمَرَ أَدْنَاهُمْ أَنْ يَقْرَأَ بِعِشْرِينَ.
‘আবু উসমান নাহদি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর রা. তিনজন হাফিজ ইমামকে রমজানে (তারাবিহ’র ইমামতির সময়) কিরাআত পড়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। সুতরাং এদের মধ্যে দ্রুতগতিসম্পন্ন হাফিজকে (প্রত্যেক রাকআতে) ত্রিশ আয়াত করে পড়ার, মধ্যমগতিসম্পন্ন হাফিজকে পঁচিশ আয়াত করে পড়ার আর ধীরগতিসম্পন্ন হাফিজকে বিশ আয়াত করে পড়ার নির্দেশ প্রদান করেন। (মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক : ৪/২৬১, হাদিস নং ৭৭৩২, প্রকাশনী : আল মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত)

এ হাদিসটির তিনজন বর্ণনাকারীই নির্ভরযোগ্য। তন্মধ্য হতে সুফইয়ান সাওরি রহ. তো হাদিসের জগতে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব ও স্বীকৃত ইমাম। আর দ্বিতীয় বর্ণনাকারী হলেন কাসিম। তবে ইমাম মুহাম্মাদ বিন নাসর রহ. ও ইমাম ইবনুস সুন্নি রহ.-এর বর্ণনায় এখানে ‘কাসিম’-এর পরিবর্তে আসিম আহওয়ালের নাম এসেছে। আর এটাই সঠিক। আসিম আহওয়াল রহ. নির্ভরযোগ্য একজন বর্ণনাকারী। ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তার ব্যাপারে বলেন, ثقة অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য। (তাকরিবুত তাহজিব : পৃ. নং ২৮৫, জীবনী নং ৩০৬০, প্রকাশনী : দারুর রশিদ, হালব) আর তৃতীয় বর্ণনাকারী হলেন, আবু উসমান নাহদি রহ.। তিনিও নির্ভরযোগ্য। ইবনে হাজার রহ. বলেন, ثقة ثبت عابد অর্থাৎ সুদৃঢ়, নির্ভরযোগ্য ও ইবাদাতগুজার। (তাকরিবুত তাহজিব : পৃষ্ঠা নং ৩৫১, জীবনী নং ৪০১৭, প্রকাশনী : দারুর রশিদ, হালব)

বর্ণনাটির রাবি তিনজন নির্ভরযোগ্য হওয়ার পাশপাশি এতে কোনো সূত্রবিচ্ছিন্নতাও নেই। সুতরাং এর সনদ সহিহ।

ইমাম মুহাম্মাদ বিন নাসর রহ. বর্ণনা করেন :
السَّائِبُ بْنُ يَزِيدَ: أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَتَمِيمًا الدَّارِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ فِي رَمَضَانَ فَكَانَ الْقَارِئُ يَقْرَأُ بِالْمِئِينَ , حَتَّى كُنَّا نَعْتَمِدُ عَلَى الْعِصِيِّ مِنْ طُولِ الْقِيَامِ وَمَا كُنَّا نَنْصَرِفُ إِلَّا فِي فُرُوعِ الْفَجْرِ
‘সায়িব বিন ইয়াজিদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর বিন খাত্তাব রা. রমজান মাসে উবাই বিন কাব রা. ও তামিমে দারি রা.-কে লোকদের নিয়ে (তারাবিহ’র) সালাত পড়ানোর আদেশ করলেন। (বর্ণনাকারী বলেন,) অতঃপর হাফিজ ইমাম সাহেব শতাধিক আয়াতবিশিষ্ট সুরা পাঠ পড়তেন। (আমাদের অবস্থা এই ছিল যে,) দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমরা লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতাম। (এভাবে সালাত পড়তে পড়তে রাত শেষ হতো। অতঃপর) আমরা ভোর হওয়ার কিছু পূর্বে (সাহরি খাওয়ার জন্য ঘরে) ফিরে আসতাম।’ (মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল, ইবনু নাসর : পৃ. নং ২২৩, প্রকাশনী : হাদিস একাডেমি, ফয়সালাবাদ; মুআত্তা মালিক : ২/১৫৮, হা. নং ৩৭৯, প্রকাশনী : মুআসসাসাতু জায়িদ বিন সুলতান, আবুধাবি)

এ হাদিসটির সনদ সহিহ। কেননা, এতে মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ রহ. ও সায়িব বিন ইয়াজিদ রা. নামে দুজন বর্ণনাকারী আছেন। মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ রহ. অত্যন্ত নির্ভযযোগ্য একজন তাবিয়ি। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাঁর ব্যাপারে বলেন, ثقة ثبت অর্থাৎ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। (তাকরিবুত তাহজিব : পৃ. নং ৫১৫, জীবনী নং ৬৪১৩, প্রকাশনী, দারুর রশিদ, হালব) আর সায়িব বিন ইয়াজিদ রা. হলেন সাহাবি, যার নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। এতে কোনো সূত্রবিচ্ছিন্নতাও নেই।

এমন আরও অনেক হাদিস ও আসার রয়েছে। কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় আমরা এতটুকুতেই ক্ষান্ত করছি। বুঝমানদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ। এসব বর্ণনা সামনে রাখলে আমরা নিন্মোক্ত বিষয়গুলো জানতে পারি।

(১) খতমে তারাবিহ সুন্নাহসম্মত একটি আমল, যার ধারাবাহিকতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময় থেকেই চলে আসছে।
(২) তারাবিহতে খতমের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। এক খতম থেকে শুরু করে দুই, তিন, চার কিংবা যত ইচ্ছা খতম করা যায়।
(৩) যারা হাফিজে কুরআন নয়, তাদের জন্য খতমে তারাবিহ’র জামাআতে শরিক হওয়া উত্তম।
(৪) খতমে তারাবিহতে কিরাআত ধীর, মধ্যম ও দ্রুত তিনভাবেই পড়া যাবে। তবে মদ, মাখরাজ ও উচ্চারণ ঠিক থাকতে হবে।
(৫) এগুলোর কোনোটিই বাধ্যতামূলক কিছু নয়। তাই এ নিয়ে সব ধরনের বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

উল্লেখ্য যে, খতমে তারাবিহতে দ্রুত কিরাআত পড়ার হাদিস থেকে আমাদের দেশে প্রচলিত পদ্ধতির অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য কিরাআত পড়ার বৈধতা প্রমাণ করার চেষ্টা করা ভুল হবে। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মসজিদে যেভাবে দ্রুত গতিতে কিরাআত পড়া হয়, সেটাকে আদৌ কিরাআত বলা যায় কিনা সন্দেহ। বেশিরভাগ জায়গায় এমন দ্রুততার সাথে কিরাআত পড়া হয়, যদ্দরুন মদ-মাখরাজ ঠিক থাকা তো দূরে থাক; কী পড়ছে সেটাই ভালো করে বুঝা যায় না। এমন কিরআত পড়া থেকে আমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। এছাড়া স্বাভাবিক নিয়মে হদরের সহিত মদ-মাখরাজ ঠিক রেখে একটু দ্রুততার সাথে পড়লে কোনো অসুবিধা নেই। হাদিসে এমন কিরাআতকেই দ্রুত কিরাআত বলা হয়েছে। বর্তমানে অনেক ভালো মাদরাসা মসজিদে ও বেশকিছু উন্নত মসজিদে এভাবে কিরাআত পড়ার প্রচলন শুরু হয়েছে। এমনটা হলে ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। এর নিম্নে যেসব কিরাআত পড়া হয়, তা পড়ার চেয়ে ধীরেসুস্থে সুরা তারাবিহ পড়া অনেকগুণে শ্রেয়। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দান করুন।

(খতমে তারাবিহ অবশ্যই উত্তম, ভালো ও সুন্নাহসম্মত একটি আমল। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের দেশে আরেকটি সমস্যা রয়েছে, আর তা হলো চুক্তি করে বিনিময় নিয়ে খতম পড়া। অধিকাংশ আলিমদের মতানুসারে খতম তারাবিহ’র জন্য এভাবে চুক্তি করে বিনিময় নেওয়া বৈধ নয়। কিছু কিছু আলিম এর জন্য নানা তাবিল ও অপশন বের করেছেন বটে, কিন্তু এর বেশিরভাগই আপত্তি থেকে মুক্ত নয়। তাই বিনিময় নিয়ে যেখানে খতম তারাবিহ পড়ানো হয়, সেখানে জামাআতে তারাবিহ পড়া ঠিক নয়। এক্ষেত্রে নিজেরা মিলে বা অন্য মসজিদে সুরা তারাবিহ পড়বে। অনুরূপ যেখানে খতমের নামে তামাশা হয়, কিরাআতের কোনো কিছুই বুঝা যায় না, বা রুকু-সিজদা ঠিকমতো আদায় করা হয় না, সেখানেও জামাআতে শরিক হওয়া ঠিক হবে না। এর চাইতে একাকী বা সম্ভব হলে অন্যদের নিয়ে ধীরস্থিরভাবে জামাআতে পড়া উচিত।)  

🖊 মুফতি তারেকুজ্জামান

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − ten =

error: Content is protected !!