সম্মিলিত মুনাজাত : কিছু হাদিস ও তার তাহকিক - MarkajulHuda    
           

Home  »  ইসলামিক প্রবন্ধ   »   সম্মিলিত মুনাজাত : কিছু হাদিস ও তার তাহকিক

সম্মিলিত মুনাজাত : কিছু হাদিস ও তার তাহকিক

সম্মিলিত মুনাজাত : কিছু হাদিস ও তার তাহকিক
মুফতি তারেকুজ্জামান (দাঃবাঃ)

[এটা কেবল পাঁচটি হাদিসের ইলমি তাহকিক, পূর্ণাঙ্গ আলোচনা নয়। এক ভাই হাদিসগুলোর তাহকিক জানতে চাওয়ায় লিখেছি। তাই প্রসঙ্গ না পাল্টানোর অনুরোধ।]

১ নং প্রশ্ন :
মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবার উদ্ধৃতিতে صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم الفجر، فلما سلَّم انحرف ورفع يديه ودعا হাদিসটি প্রচার করা হয়। এ হাদিসের শেষাংষে বলা হয়েছে- ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ফজরের সালাতে) সালাম ফেরানোর পর ঘুরে বসলেন এবং উভয় হাত তুলে দুআ করলেন।’ আমার জানার বিষয় হলো, আসলেই কি এটা মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবা কিংবা অন্য কোনো হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে? এ হাদিস দ্বারা কি প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাতকে সুন্নাত বা মুসতাহাব সাব্যস্ত করা ঠিক আছে?

উত্তর :
হ্যাঁ, এরকম একটি হাদিস মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবা-তে বর্ণিত হয়েছে। তবে আপনি হাদিসের যে শেষাংশের কথা উল্লেখ করেছেন, তা মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবা বা অন্য কোনো হাদিসের কিতাবে কোথাও বর্ণিত হয়নি। বিধায় এ অংশটুকু ভিত্তিহীন। মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবার হাদিসটির মূলভাষ্য হলো-
حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، قَالَ: نا يَعْلَى بْنُ عَطَاءٍ، عَنْ جَابِرِ بْنِ يَزِيدَ بْنِ الْأَسْوَدِ الْعَامِرِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْفَجْرَ، فَلَمَّا سَلَّمَ انْحَرَفَ
‘ইয়াজিদ বিন আসওয়াদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ফজরের সালাত আদায় করলাম। অতঃপর যখন তিনি সালাম ফেরালেন, তখন ঘুরে বসলেন। (মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ৩০৯৩)

হাদিসটির সনদ সহিহ। তবে এতে ورفع يديه ودعا (এবং দু’হাত উত্তোলন করে দুআ করলেন) অংশটি ভিত্তিহীন। কোনো সনদেই এই অংশটুকু বর্ণিত হয়নি। তাই যারা এ অংশটিকে মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবার হাদিস বলে, তারা ভুলের মধ্যে আছে।

শাইখ আলবানি রহ. বলেন :
فقوله: (ورفع يديه ودعا) ! فإن هذه الزيادة لا أصل لها في المصنف ولا عند غيره ممن أخرج الحديث
‘তার উক্তি “এবং দু’হাত উত্তোলন করে দুআ করলেন” এই অতিরিক্ত অংশটির কোনো ভিত্তি নেই; না মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবাতে আছে, আর না হাদিস বর্ণনা করেছে এমন অন্য কারও কাছে আছে।’ (সিলসিলাতুল আহাদিসিজ জইফা : ১২/৪৫৩)

হাদিসটি মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবা ছাড়াও আরও অনেক হাদিসগ্রন্থে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। যথা-
মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ৬৬৪২, ৩৬১৭৭, মুসান্নাফু আবদির রাজ্জাক : ৩৯৩৪, মুসনাদু আহমাদ : ১৭৪৭৫, ১৭৪৫৬, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবুন সাদ : ৫/৫১৭, সুনানু আবি দাউদ : ৬১৪, সুনানুন নাসায়ি : ১৩৩৪, সুনানুত তিরমিজি : ২১৯, আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ১২৫৮, সহিহু ইবনি খুজাইমা : ১৭১৩, সহিহু ইবনি হিব্বান : ১৫৬৫, আল-আহাদ ওয়াল মাসানি : ১৪৬২, সুনানুদ দারাকুতনি : ১৫৩৪, আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি : ২২/২৩২, আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ২৯৯৯, ৩৬৪৫, আস-সুনানুস সগির, বাইহাকি : ৬৫২, আল-খিলাফিয়্যাত, বাইহাকি : ২১১২, মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার : ৪৩১১, শারহুস সুন্নাহ : ৭০৫

এগুলোর কোনোটির সনদেই অতিরিক্ত ওই অংশটি বর্ণিত হয়নি। সুতরাং মুসান্নাফে ইবনি আবি শাইবার নামে প্রচারিত ভিত্তিহীন হাদিসাংশের দ্বারা ফরজ সালাতের পর প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাতকে সুন্নাত বা মুসতাহাব প্রমাণ করা কোনো আহলে ইলমের শান হতে পারে না।
.

২ নং প্রশ্ন :
ইবনে আবি হাতিমের উদ্ধৃতিতে একটি হাদিস বলা হয় যে, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত আদায়ের পর কিবলামুখী হয়ে দুআ করেছেন।’ আরও বলা হয় যে, হাদিসটির সব বর্ণনাকারীই বুখারি, মুসলিমের বর্ণনাকারী, যারা সবাই নির্ভরযোগ্য। তাই হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহিহ। আমার জানার বিষয় হলো, এ কথাগুলো কতটুকু সঠিক? দয়া করে বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর :
হ্যাঁ, এ মর্মে একটি হাদিস তাফসিরে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদিসটির সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য এবং হাদিসটি সহিহ বলে যা প্রচার করা হয়, তা সঠিক নয়। প্রথমে হাদিসটির মূলভাষ্য দেখুন-
حَدَّثَنَا أَبِي، ثنا أَبُو مَعْمَرٍ الْمِنْقَرِيُّ، ثنا عَبْدُ الْوَارِثِ، ثنا عَلِيِّ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَن ّرَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَفَعَ يَدَهُ بَعْدَ مَا سَلَّمَ وَهُوَ مُسْتَقْبِلٌ الْقِبْلَةَ، فَقَالَ : اللَّهُمَّ خَلِّصِ الْوَلِيدَ بْنَ الْوَلِيدِ، وَعَيَّاشَ بْنَ أَبِي رَبِيعَةَ، وَسَلَمَةَ بْنَ هِشَامٍ، وَضَعَفَةَ الْمُسْلِمِينَ الَّذِينَ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلا يَهْتَدُونَ سَبِيلا مِنْ أَيْدِي الْكُفَّارِ.
‘আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সালাতের) সালাম ফেরানোর পর কিবলামুখী হয়ে হাত উত্তোলন করে বললেন, “হে আল্লাহ, আপনি অলিদ বিন অলিদ, আইয়াশ বিন আবি রবিআ, সালামা বিন হিশাম ও অসহায় দুর্বল মুসলিমদের কাফিরদের হাত থেকে মুক্তি দান করুন, যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারছে না এবং কোনো পথও খুঁজে পাচ্ছে না।”’ (তাফসিরু ইবনি আবি হাতিম : ৫৮৭২)

এ হাদিসে বর্ণিত দুআটি (হে আল্লাহ, আপনি অলিদ বিন অলিদ…) বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত। অনেক সহিহ হাদিসে এ দুআটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সালাতের) সালাম ফেরানোর পর কিবলামুখী হয়ে হাত উত্তোলন করেছেন’ কথাটুকু বিশুদ্ধ নয়। কারণ-

প্রথমত, এর সনদে ‘আলি বিন জাইদ’ নামে একজন রাবি আছে, যাকে মুহাদ্দিসিনে কিরাম দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। দেখুন, আল-জারহু ওয়াত-তাদিল : ৬/১০২১, মিজানুল ইতিদাল : ৪/৫৮৫৫, লিসানুল মিজান : ৫/৫৪০, তাকরিবুত তাহজিব : ৪৭৩৪

দ্বিতীয়ত, আলি বিন জাইদ সূত্রে হাদিসটি দু’ভাবে বর্ণিত হয়েছে। যথা-
এক : ইমাম ইবনে আবি হাতিম রাজি রহ. বর্ণনা করেন :
حَدَّثَنَا أَبِي، ثنا أَبُو مَعْمَرٍ الْمِنْقَرِيُّ، ثنا عَبْدُ الْوَارِثِ، ثنا عَلِيِّ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَن ّرَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَفَعَ يَدَهُ بَعْدَ مَا سَلَّمَ وَهُوَ مُسْتَقْبِلٌ الْقِبْلَةَ، فَقَالَ : اللَّهُمَّ خَلِّصِ الْوَلِيدَ…
‘আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সালাতের) সালাম ফিরানোর পর কিবলামুখী হয়ে হাত উত্তোলন করে বললেন, “হে আল্লাহ, আপনি অলিদ বিন অলিদকে মুক্তি দান করুন…’” (তাফসিরু ইবনি আবি হাতিম : ৫৮৭২)

দুই : ইমাম আহমাদ রহ. বর্ণনা করেন :
حَدَّثَنَا عَفَّانُ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، قَالَ: أَخْبَرَنَا عَلِيُّ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ الْقُرَشِيِّ، أَوْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ عُبْيَدِ اللهِ الْقُرَشِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ يَدْعُو فِي دُبُرِ صَلَاةِ الظُّهْرِ: اللهُمَّ خَلِّصِ الْوَلِيدَ…
‘আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জোহরের সালাতের পর দুআ করলেন, “হে আল্লাহ, আপনি অলিদ বিন অলিদকে মুক্তি দান করুন…”’ (মুসনাদু আহমাদ : ৯২৮৫)

এ হাদিসের ব্যাপারে শাইখ শুআইব আরনাউত রহ. বলেন :
صحيح دون قوله: “دبر صلاة الظهر”، وهذا إسناد ضعيف لضعف علي بن زيد وهو ابن جدعان،
‘হাদিসের “জোহরের সালাতের পর” অংশ ব্যতীত বাকিটুকু বিশুদ্ধ। আর আলি বিন জাইদ দুর্বল বর্ণনাকারী হওয়ায় এটার সনদ দুর্বল।’ (আত-তালিক আলা মুসনাদি আহমাদ : ১৫/১৬২)

এ দুটি বর্ণনার প্রথমটি থেকে বুঝা যাচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজের পর কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দুআ করেছেন। আর দ্বিতীয় বর্ণনা থেকে বুঝা যাচ্ছে, তিনি জোহরের সালাতের পর দুআ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি বিশুদ্ধ নয়। কেননা, আলি বিন জাইদের বিপরীতে ইমাম জুহরি রহ. বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুআটি জোহরের নামাজের পর বা সালামের পর করেননি; বরং তিনি সালাতে রুকু থেকে ওঠার পর সিজদায় যাওয়ার আগে এ দুআ করেছেন। আর অনেক বিশুদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, সেটা ছিল ফজরের সালাত। যেমন সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে :
حَدَّثَنِي أَبُو الطَّاهِرِ، وَحَرْمَلَةُ بْنُ يَحْيَى، قَالَا: أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ، أَخْبَرَنِي يُونُسُ بْنُ يَزِيدَ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ: أَخْبَرَنِي سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيِّبِ، وَأَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، أَنَّهُمَا سَمِعَا أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ: كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ حِينَ يَفْرُغُ مِنْ صَلَاةِ الْفَجْرِ مِنَ الْقِرَاءَةِ، وَيُكَبِّرُ وَيَرْفَعُ رَأْسَهُ: «سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ»، ثُمَّ يَقُولُ وَهُوَ قَائِمٌ: «اللهُمَّ أَنْجِ الْوَلِيدَ بْنَ الْوَلِيدِ، وَسَلَمَةَ بْنَ هِشَامٍ، وَعَيَّاشَ بْنَ أَبِي رَبِيعَةَ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
‘আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ফজরের সালাতে কিরাআত পড়া শেষ করতেন এবং (রুকু দিয়ে) তাকবির বলে মাথা উঠাতেন তখন বলতেন “সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ রাব্বানা লাকাল হামদ”। এরপর দাঁড়ানো অবস্থায়ই এ দুআ করতেন, “হে আল্লাহ, আপনি অলিদ বিন অলিদকে মুক্তি দান করুন…’” (সহিহ মুসলিম : ৬৭৫ )
এ ব্যাপারে আরও অসংখ্য বর্ণনায় এসেছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা সালাতের মধ্যেই রুকু থেকে ওঠার পরে করেছেন, জোহরের সালাতের শেষে বা সালাম ফেরানোর পরে নয়। দেখুন-
সহিহুল বুখারি : ৮০৪, ৪৫৬০, ৬২০০, সুনানুন নাসায়ি : ১০৭৩, ১০৭৪, সুনানু ইবুন মাজাহ : ১২৪৪, সহিহু ইবনি খুজাইমা : ৬১৫, সহিহু ইবনি হিব্বান : ১৯৬৯, ১৯৭২, ১৯৮৩, আল-মুনতাকা, ইবনুল জারুদ : ১৯৭, মুসনাদুশ শাফিয়ি : ২৬৮, ২৬৯, মুসনাদু আহমাদ : ৭২৬০, ৭৪৬৫, ৭৬৬৯, ৯১৪৯, ৯৪১৪, মুসনাদুল হুমাইদি : ৯৬৮, মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৫৮৭৩, মুসনাদুস সাররাজ : ১৩০১, ১৩০৪, ১৩০৫, ১৩০৬, ১৩৪০, মুসতাখরাজু আবি আওয়ানা : ২১৬৭, ২১৭৭, মুসান্নাফু আবদির রাজ্জাক : ৪০২৮, মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ৭১১৯, আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৬৬৪, ৬৬৫, আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৬৬৪, ৬৬৫, মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার : ৩৯২৯, ৪১৩১, শারহু মুশকিলিল আসার : ৫৬৯, ১৩৩৬, শারহুস সুন্নাহ, বাগাবি : ৬৩৬, ৬৩৭,

এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আলি বিন জাইদ দুর্বল বর্ণনাকারী হওয়ার পাশাপাশি জুহরি রহ.-এর মতো বিখ্যাত ইমামের বিপরীত বর্ণনা করেছেন; যদিও দুজনই সাইদ বিন মুসাইয়িব রহ.-এর ছাত্র। আবার আলি বিন জাইদের পক্ষে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর সমর্থনও নেই, যার ভিত্তিতে তার বর্ণনাটিকে শক্তিশালী বলা যায়। তাই উসুলে হাদিসের আলোকে সন্দেহাতীতভাবে এখানে ইমাম জুহরি রহ.-এর বর্ণনাটিই গ্রহণীয় হবে এবং আলি বিন জাইদের বর্ণনাটি মুনকার বা প্রত্যাখ্যাত বলে বিবেচিত হবে।

অতএব, এ হাদিসের ওই অতিরিক্ত অংশটুকু (‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম [সালাতের] সালাম ফেরানোর পর কিবলামুখী হয়ে হাত উত্তোলন করেছেন’) মুনকার, যা দ্বারা মাসায়িল বা ফাজায়িল কোনো ক্ষেত্রেই দলিল দেওয়া যাবে না। যখন বিশুদ্ধ মতানুসারে প্রমাণিত হলো যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুআ ফজরের নামাজের দ্বিতীয় রাকআতে রুকু থেকে ওঠার পর পড়তেন, তখন এ হাদিস দ্বারা ফরজ সালাতের পর হাত তুলে দুআ করা সুন্নাত বা মুসতাহাব হওয়ার প্রমাণ দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

উল্লেখ্য যে, বুখারি, মুসলিমের বর্ণনাকারী হলেই সে নির্ভরযোগ্য হয়ে যায় না; বরং লক্ষ্য করতে হয়, সে বুখারি, মুসলিমের মূল হাদিসের প্রধান বর্ণনাকারী নাকি অন্য কোনো বর্ণনাকারী। উলুমুল হাদিস সম্বন্ধে প্রাজ্ঞ সবারই জানা যে, বুখারি, মুসলিমের মূল হাদিসের প্রধান বর্ণনাকারীগণ সবাই নির্ভরযোগ্য। কিন্তু মুতাবি, শাহিদ (সহায়ক) হাদিসের বর্ণনাকারীগণ এবং মাকরুন বিল-গাইর (অন্যের অনুগামী) বর্ণনাকারীদের সবাই-ই নির্ভরযোগ্য হয় না। বরং তাদের মধ্যে যেমন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী রয়েছে, অনুরূপ অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীও রয়েছে। এ হাদিসের আলোচিত রাবি আলি বিন জাইদ মুসলিমের বর্ণনাকারী হলেও সে মূল হাদিসের প্রধান বর্ণনাকারী নয়; বরং অন্য একজন নির্ভরযোগ্য রাবির অনুগামী হয়ে এসেছে। তাই তাকে মুসলিমের রাবি আখ্যা দিয়ে চোখ বন্ধ করে নির্ভরযোগ্য বলে দেওয়াটা সঠিক জ্ঞানের পরিচায়ক নয়। বিস্তারিত দেখুন, আত-তালিক আলা তাকরিবিত তাহজিব, শাইখ আওয়ামা : পৃ. নং ৫৫২, জীবনী নং ৪৭৩৪
.

৩ নং প্রশ্ন :
এক সাহাবি নাকি বাহরাইনে গিয়ে তাঁর সঙ্গীসাথিদের নিয়ে ফরজ সালাতের পর সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দুআ করেছেন। এ ব্যাপারে কি কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়? পাওয়া গেলে সে বর্ণনাটি কি সহিহ ও প্রমাণযোগ্য? দলিল সহকারে বিস্তারিত জানিয়ে কতৃজ্ঞ করবেন।

উত্তর :
হ্যাঁ, তারিখে তাবারিতে এ মর্মে একটি দীর্ঘ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যদিও এর বিশুদ্ধতা ও প্রামাণ্যতা নিয়ে কথা আছে। আমরা প্রথমে তারিখে তাবারির বর্ণনাটির মূলভাষ্যটি দেখে নিই-
كَتَبَ إِلَيَّ السَّرِيُّ، عَنْ شُعَيْبٍ، عَنْ سيف، عن الصعب بن عطية ابن بِلالٍ، عَنْ سَهْمِ بْنِ مِنْجَابٍ، عَنْ مِنْجَابِ بْنِ رَاشِدٍ، قَالَ: بَعَثَ أَبُو بَكْرٍ الْعَلاءَ بْنَ الْحَضْرَمِيِّ عَلَى قِتَالِ أَهْلِ الرِّدَّةِ بِالْبَحْرَيْنِ… فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ، لا تُرَاعُوا، أَلَسْتُمْ مُسْلِمِينَ! أَلَسْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ! أَلَسْتُمْ أَنْصَارَ الله! قالوا: بلى، قال : فابشروا، فو الله لا يَخْذُلُ اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي مِثْلِ حَالِكُمْ وَنَادَى الْمُنَادِي بِصَلاةِ الصُّبْحِ حِينَ طَلَعَ الْفَجْرُ فَصَلَّى بِنَا، وَمِنَّا الْمُتَيَمِّمُ، وَمِنَّا مَنْ لَمْ يَزَلْ عَلَى طُهُورِهِ، فَلَمَّا قَضَى صَلاتَهُ جَثَا لِرُكْبَتَيْهِ وَجَثَا النَّاسُ، فَنَصَبَ فِي الدُّعَاءِ وَنَصَبُوا مَعَهُ.
‘মিনজাব বিন রাশিদ রা. বলেন, আবু বকর রা. বাহরাইনের মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আলা বিন হাজরামি রা.-কে প্রেরণ করলেন। …অতঃপর আলা রা. বললেন, হে লোকসকল, তোমরা (এ ব্যাপারে) কোনো চিন্তা কোরো না। তোমরা কি মুসলমান নও? তোমরা কি আল্লাহর রাস্তায় নও? তোমরা কি আল্লাহর সাহায্যকারী বাহিনী নও? সবাই সমস্বরে বলল, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহর শপথ! তোমাদের মতো আল্লাহর রাস্তায় থাকা লোকদের তিনি কখনো অপদস্ত করবেন না। এরপর সুবহে সাদিক হলে মুআজ্জিন ফজরের আজান দিল। অতঃপর তিনি সালাত পড়ালেন। আমাদের কিছু লোক তায়াম্মুম করল, আর কিছু লোকের আগে থেকেই অজু ছিল। এরপর সালাত শেষ হলে তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন, লোকেরাও সেভাবে বসল। অতঃপর তিনি দুআয় নিমগ্ন হলে লোকেরাও তাঁর সাথে দুআয় নিমগ্ন হলো।’ (তারিখুত তাবারি : ৩/৩০৭)

এ বর্ণনাটি অত্যধিক দুর্বল। কেননা, এতে পরপর তিনজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছে, যা বর্ণনাটিকে একেবারে দুর্বল করে দিয়েছে। একজন হলো, শুআইব বিন ইবরাহিম কুফি। মুহাদ্দিসদের নিকট সে মাজহুল বা অজ্ঞাত। দেখুন, লিসানুল মিজান : ৪/২৪৬, মিজানুল ইতিদাল : ৩/৩৭১২

আরেকজন বর্ণনাকারী হলো সাইফ বিন উমর তামিমি। মুহাদ্দিসদের নিকট সে একজন দুর্বল বর্ণনাকারী; বরং অনেকের নিকট তো সে মাতরুক বা পরিত্যক্ত। দেখুন, আল-জারহু ওয়াত-তাদিল : ৪/১১৯৮, সুওয়ালাতুল আজুরি : ৫/৪৩, সুওয়ালাতুল বারকানি : ২০০, তাহজিবুত তাহজিব : ১২/৩২৭, তাকরিবুত তাহজিব : ২৭২৪

আরেকজন বর্ণনাকারী হলো আস-সায়িব বিন আতিয়্যা বিন বিলাল। এ বর্ণনাকারীও মাজহুল বা অজ্ঞাত। দেখুন, আল-মুজামুস সগির লি-রুওয়াতিল ইমামি ইবনি জারির : ১/২৪৯

সুতরাং এ বর্ণনাটি যেহেতু অত্যধিক দুর্বল, যা কোনো ক্ষেত্রেই প্রমাণযোগ্য নয়, তাই এদ্বারা কোনো বিধান বা ফজিলত সাব্যস্ত হবে না। দ্বিতীয়ত, বর্ণনাটিতে দুআ করার কথা পাওয়া গেলেও এতে হাত তোলার কোনো কথা বর্ণিত হয়নি। আমরা জানি, দুআ হাত তোলাসহ এবং হাত তোলা ছাড়া উভয়ভাবে করা যায়। তাই এ হাদিসে কোনো কিছুর উল্লেখ না থাকায় এ থেকে ফরজ সালাতের পর সম্মিলিতভাবে হাত তোলা সাব্যস্ত হচ্ছে না, যেটা ছিল মূল দাবি। তাছাড়াও এটা ফরজ নামাজের পর নিয়মতান্ত্রিক কোনো দুআ ছিল না; বরং তারা সবাই সফরে একটা বিপদে পড়েছিলেন। সে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যই তারা সবাই আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করে দুআ করেছিলেন। আর বিপদে পড়ে এভাবে সবার দুআ করার বিষয়ে কারও কোনো মতানৈক্য নেই। তাই এ বর্ণনা দ্বারা ফরজ নামাজের পর নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাত সুন্নাত বা মুসতাহাব হওয়ার প্রমাণ দেওয়া বাতুলতা বৈ কি!
.

৪ নং প্রশ্ন :
এক হাদিসে নাকি সালাতের পর ইমাম এককভাবে দুআ করলে তাকে খিয়ানতকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ থেকে প্রমাণ দেওয়া হয় যে, ইমাম, মুক্তাদি সম্মিলিতভাবে দুআ করবে। আমার জানার বিষয় হলো, এ কথা কি ঠিক আছে? এ মর্মে বর্ণিত হাদিসটি কি বিশুদ্ধ বা প্রমাণযোগ্য? আর হাদিসটির যে ব্যাখ্যা দেওয়া হলো, সেটা কতটুকু সঠিক? দয়া করে সবিস্তরে জানাবেন।

উত্তর :
একাধিক হাদিসগ্রন্থে এ মর্মে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটির মূলভাষ্য হলো-
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عِيسَى، حَدَّثَنَا ابْنُ عَيَّاشٍ، عَنْ حَبِيبِ بْنِ صَالِحٍ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ شُرَيْحٍ الْحَضْرَمِيِّ، عَنْ أَبِي حَيٍّ الْمُؤَذِّنِ، عَنْ ثَوْبَانَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ثَلَاثٌ لَا يَحِلُّ لِأَحَدٍ أَنْ يَفْعَلَهُنَّ: لَا يَؤُمُّ رَجُلٌ قَوْمًا فَيَخُصُّ نَفْسَهُ بِالدُّعَاءِ دُونَهُمْ، فَإِنْ فَعَلَ فَقَدْ خَانَهُمْ، وَلَا يَنْظُرُ فِي قَعْرِ بَيْتٍ قَبْلَ أَنْ يَسْتَأْذِنَ، فَإِنْ فَعَلَ فَقَدْ دَخَلَ، وَلَا يُصَلِّي وَهُوَ حَقِنٌ حَتَّى يَتَخَفَّفَ
‘সাওবান রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনটি কাজ করা কারও জন্য হালাল নয়। (এক) কোনো ব্যক্তি ইমাম হয়ে অন্যের জন্য দুআ না করে শুধুমাত্র নিজের জন্য দুআ করবে। এরূপ করলে সে তো তাদের সাথে প্রতারণা করল। (দুই) অনুমতি গ্রহণের পূর্বে কেউ কারও ঘরের অভ্যন্তরে উঁকি মেরে দেখবে না। কেননা, এরূপ করাটা তার ঘরে প্রবেশেরই নামান্তর। (তিন) পায়খানা-পেশাবের বেগ চেপে রেখে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত কেউ সালাত আদায় করবে না।’ (সুনানু আবি দাউদ : ৯০)

এছাড়াও হাদিসটি আরও অনেক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। যথা-
সুনানুত তিরমিজি : ৩৫৭, সুনানু ইবনি মাজাহ : ৯২৩, মুসনাদু আহমাদ : ২২১৫২, ২২২৪১, আল-আদাবুল মুফরাদ : ১০৯৩, মুসনাদুল বাজ্জার : ৪১৮০, মুসনাদুশ শামিয়্যিন : ১০৪২, মুজামু ইবনিল মুকরি : ৬২, শুআবুল ইমান : ১০৬৭০, শারহুস সুন্নাহ : ৬৪১, মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার : ৫৯৬৯

হাদিসটি একাধিক সনদে বর্ণিত হলেও ‘কোনো ব্যক্তি ইমাম হয়ে অন্যের জন্য দুআ না করে শুধুমাত্র নিজের জন্য দুআ করবে’ অংশটুকু বিশুদ্ধ সনদে কোথাও বর্ণিত হয়নি। তাই মুহাদ্দিসিনে কিরাম হাদিসের এ অংশটুকুকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন।

শাইখ শুআইব আরনাউত রহ. বলেন :
صحيح لغيره دون قوله: “لا يؤم رجل قوماً فيخص نفسه بالدعاء دونهم”، وهذا إسناد ضعيف، يزيد بن شريح لم يؤثر توثيقه عن غير ابن حبان، وقال الدارقطني: يُعتبر به، يعني في المتابعات والشواهد، وقد انفرد بالقطعة المذكورة،
‘হাদিসের মধ্যে “কোনো ব্যক্তি ইমাম হয়ে অন্যের জন্য দুআ না করে কেবল নিজের জন্য দুআ করবে” অংশটুকু ছাড়া বাকি হাদিস সহিহ লি-গাইরিহি। আর এটা দুর্বল একটি সনদ। ইয়াজিদ বিন শুরাইহের ব্যাপারে ইবনে হিব্বান রহ. ছাড়া অন্য কারও তাওসিক (নির্ভরযোগ্য ঘোষণা) থাকলেও তা কার্যকর কোনো প্রভাব ফেলবে না। ইমাম দারাকুতনি রহ. বলেন, তার বিষয়টি বিবেচনার উপযুক্ত, অর্থাৎ মুতাবি ও শাহিদ হাদিসের ক্ষেত্রে (মূল হাদিসের ক্ষেত্রে নয়)। আর হাদিসের এ অংশটি সে এককভাবে বর্ণনা করেছে।’ (আত-তালিক আলা সুনানি আবি দাউদ : ১/৬৭)

সুতরাং এ হাদিসটির প্রথম অংশটুকু (কোনো ব্যক্তি ইমাম হয়ে অন্যের জন্য দুআ না করে শুধু নিজের জন্য দুআ করবে) বিশুদ্ধ না হওয়ায় এদ্বারা ইমাম, মুক্তাদি মিলে সম্মিলিত দুআ সুন্নাত বা মুসতাহাব হওয়ার প্রমাণ দেওয়া সঠিক নয়।

হাদিসটির ব্যাখ্যা : হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ বলেন, এখানে ইমাম অন্যের জন্য দুআ না করে শুধু নিজের জন্য দুআ করার ব্যাপারে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা কেবল নামাজের মধ্যে দুআ কুনুতের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। এখানে কথাটি সালামের পর ইমাম-মুক্তাদি মিলে সম্মিলিত মুনাজাতের ব্যাপারে বলা হয়নি। হাদিস বিশারদগণ এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে আলোচনা করেছেন।

আল্লামা মুহাম্মাদ আশরাফ বিন আমির আজিমাবাদি রহ. বলেন :
(بِالدُّعَاءِ دُونَهُمْ) قَالَ الْعَزِيزِيُّ أَيْ فِي الْقُنُوتِ خَاصَّةً بِخِلَافِ دُعَاءِ الِافْتِتَاحِ وَالرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ وَالْجُلُوسِ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ وَالتَّشَهُّدِ. وَقَالَ فِي التَّوَسُّطِ مَعْنَاهُ تَخْصِيصُ نَفْسِهِ بِالدُّعَاءِ فِي الصَّلَاةِ وَالسُّكُوتِ عَنِ الْمُقْتَدِينَ وَقِيلَ نَفْيُهُ عَنْهُمْ كَارْحَمْنِي وَمُحَمَّدًا وَلَا تَرْحَمْ مَعَنَا أَحَدًا وَكِلَاهُمَا حَرَامٌ أَوِ الثَّانِي حَرَامٌ فَقَطْ لِمَا رُوِيَ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ بَعْدَ التَّكْبِيرِ اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنْ خَطَايَايَ
‘মুক্তাদিদের জন্য দুআ না করে শুধু নিজের জন্য দুআ’ : (এর ব্যাখ্যায়) আল্লামা আজিজি রহ. বলেন, অর্থাৎ শুধু কুনুতের ক্ষেত্রেই এমনটি করা যাবে না। অন্যথায় সানা, রুকু-সিজদা, দু’সিজদার মাঝে ও বৈঠকের দুআর ক্ষেত্রে (মুক্তাদিদের বাদ দিয়ে কেবল ইমামের জন্য) একবচনের শব্দ দিয়েই দুআ হয়ে থাকে। (আওনুল মাবুদ : ১/১১২)

আল্লামা মুবারকপুরি রহ. বলেন :
وَقَالَ فِي التَّوَسُّطِ مَعْنَاهُ تَخْصِيصُ نَفْسِهِ بِالدُّعَاءِ فِي الصَّلَاةِ وَالسُّكُوتِ عَنِ الْمُقْتَدِينَ وَقِيلَ نَفْيُهُ عَنْهُمْ كَارْحَمْنِي وَمُحَمَّدًا وَلَا تَرْحَمْ مَعَنَا أَحَدًا وَكِلَاهُمَا حَرَامٌ أَوِ الثَّانِي حَرَامٌ فَقَطْ لِمَا رُوِيَ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ بَعْدَ التَّكْبِيرِ اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنْ خَطَايَايَ
তাওয়াসসুত গ্রন্থে মুসান্নিফ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে সালাতে দুআর ক্ষেত্রে শুধু নিজের কথাই উল্লেখ করা এবং মুক্তাদিদের ব্যাপারে নীরব থাকা। কারও মতে মুক্তাদিদের দুআ থেকে বাদ দেওয়া; যেমন এভাবে বলা আমাকে আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দয়া করুন। আমাদের সাথে আর কাউকে দয়া করবেন না। এ উভয় প্রকার দুআ করা হারাম, অথবা শুধু দ্বিতীয় প্রকারের দুআ হারাম (প্রথম প্রকারের দুআ নয়)। কেননা, বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকবিরে তাহরিমার পর এ দুআ করতেন, হে আল্লাহ আমাকে সকল ভুল-ত্রুটি থেকে পরিশুদ্ধ করুন। (তুহফাতুল আহওয়াজি : ২/২৮৭, গায়াতুল মাকসুদ : ১/২৯৭-২৯৮)

সুতরাং প্রথমত তো হাদিসের ওই অংশটি দলিলযোগ্যই নয়। দ্বিতীয়ত দলিলযোগ্য বলে মেনে নিলেও এখানে সালাতের শেষে দুআ করার কথা বলা হয়নি; বরং বিতর বা ফজরের সালাতে কুনুত পড়ার সময় ইমামের নিজের জন্য কেবল দুআ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করে কিংবা একবচনের শব্দ ব্যবহার করলেও নিয়তের মধ্যে মুক্তাদিদেরকে দুআয় শামিল করবে। তাই এ হাদিস দ্বারা ফরজ সালাতের পর প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাত সুন্নাত বা মুসতাহাব প্রমাণ করা সুস্পষ্ট ভুল।
.

৫ নং প্রশ্ন :
একটি হাদিসে নাকি এসেছে যে, ফরজ সালাতের পর দুআ করলে তা কবুল হয়। এজন্য অনেকে বলে যে, এ হাদিস থেকে ফরজ সালাতের পর যখন দুআ করা সাব্যস্ত হচ্ছে, আর অন্যান্য হাদিসে দুআ করার সময় হাত উঠানো এবং সম্মিলিতভাবে করার প্রমাণও পাওয়া যায়, তাই এদ্বারা ফরজ সালাতের পর প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাত মুসতাহাব সাব্যস্ত হয়। তাদের এ কথা কি ঠিক আছে? না হলে এ ব্যাপারে সঠিক ব্যাখ্যা কী?

উত্তর :
এ হাদিসটি সুনানে তিরমিজিতে হাসান সনদে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটির মূলভাষ্য হলো-
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى الثَّقَفِيُّ الْمَرْوَزِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ غِيَاثٍ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَابِطٍ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، قَالَ: قِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ: أَيُّ الدُّعَاءِ أَسْمَعُ؟ قَالَ: جَوْفَ اللَّيْلِ الآخِرِ، وَدُبُرَ الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَاتِ.
‘আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, কোন সময়ের দুআ বেশি গ্রহণযোগ্য? তিনি বললেন, শেষ রাতের মধ্যভাগের এবং ফরজ নামাজগুলোর শেষের দুআ।’ (সুনানুত তিরমিজি : ৩৪৯৯)

হাদিসটি আরও কয়েকটি কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। যথা-
আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৯৮৫৬, আমালুল ইয়াউমি ওয়াল-লাইলা, নাসায়ি : ১০৮, আদ-দা’ওয়াতুল কাবির : ৬৭০, আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব : ২৫৫০

এ হাদিসে وَدُبُرَ الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَاتِ (ফরজ নামাজগুলোর শেষে) এর ব্যাখ্যা নিয়ে উলামায়ে কিরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে। একদল উলামায়ে কিরামের মতে এখানে ‘ফরজ সালাতের শেষে’ বলতে সালাতের শেষভাগ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তাশাহহুদ ও দরুদের পর সালাম ফেরানোর আগে যে দুআ করা হয়, সেটার ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, এ দুআ আল্লাহর নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য ও কবুলযোগ্য। আর অন্য আরেকদল উলামায়ে কিরামের মতে এখানে সালাতের শেষে সালাম ফেরানোর পর যেসব দুআ পড়া হয়, সেগুলো উদ্দেশ্য।

যে ব্যাখ্যাই উদ্দেশ্য নেওয়া হোক না কেন, এ হাদিস থেকে কিছুতেই সালাতের পর ইমাম-মুক্তাদি মিলে সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে দুআ করা মুসতাহাব সাব্যস্ত হয় না। কেননা, ফরজ সালাতের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোট-বড় অসংখ্য দুআ পড়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, কিন্তু এতে কখনো সাহাবিদের নিয়ে হাত উত্তোলন করে নিয়মিতভাবে দুআ করেননি; যেমনটি আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। এ হাদিস থেকে শুধু এতটুকুই সাব্যস্ত হয় যে, ফরজ সালাতের শেষে দুআ কবুল হয়। আর এ দুআ কবুলের জন্য আমাদের অবশ্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তারা যেভাবে দুআ করেছেন, সেভাবেই করতে হবে। নিজের মনমতো করে সেটাকে সুন্নাত বা মুসতাহাব আখ্যা দেওয়া সঠিক পদ্ধতি নয়।

ফরজ সালাতের সালামের পর দুআ কবুল হয়, এ ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে যদি ইমাম-মুক্তাদির সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দুআ করা মুসতাহাবই বলা হয়, তাহলে তো সালাতের আগেও ইমাম-মুক্তাদির সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা মুসতাহাব সাব্যস্ত হওয়ার কথা। কেননা, সেটাও দুআ কবুলের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। যেমন আনাস রা. থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,لَا يُرَدُّ الدُّعَاءُ بَيْنَ الْأَذَانِ وَالْإِقَامَةِ অর্থাৎ, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী দুআ কখনো প্রত্যাখ্যাত হয় না। (সুনানু আবি দাউদ : ৫২১) এভাবে কুরআন-হাদিসে যত জায়গায় দুআ কবুলের কথা বলা হয়েছে, সব জায়গাতেই এভাবে সম্মিলিত মুনাজাত সুন্নাত বা মুসতাহাব হওয়ার কথা। অথচ প্রচলিত মুনাজাত মুসতাহাব হওয়ার প্রবক্তারাও এটা স্বীকার করবেন না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে তো অনেকে কিছু কিছু মুনাজাতকে বিদআতও বলেছেন। তাই এ হাদিস দ্বারা ফরজ সালাতের পর প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাত প্রমাণ করা চেষ্টা করা পুরোই ভুল পদ্ধতি।

আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং সিরাতে মুসতাকিমের ওপর অটল রাখুন।

Leave a Reply

Thanks for choosing to leave a comment.your email address will not be published. If you have anything to know then let us know. Please do not use keywords in the name field.Let's make a good and meaningful conversation.

5 × 1 =

error: Content is protected !!