সিরাতুন্নবি বনাম মিলাদুন্নবি : কিছু কথা ও একটি পর্যালোচনা - MarkajulHuda    
           

Home  »  ইসলামিক প্রবন্ধ   »   সিরাতুন্নবি বনাম মিলাদুন্নবি : কিছু কথা ও একটি পর্যালোচনা

সিরাতুন্নবি বনাম মিলাদুন্নবি : কিছু কথা ও একটি পর্যালোচনা

সিরাতুন্নবি বনাম মিলাদুন্নবি : কিছু কথা ও একটি পর্যালোচনা
মুফতি তারেকুজ্জামান (দাঃবাঃ)

‘সিরাতুন্নবি’ আরবি শব্দ। যা ‘সিরাত’ ও ‘আন-নবি’ শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। ‘সিরাত’ অর্থ জীবনী, চরিত, চরিত্র, অভ্যাস। আর ‘নবি’ অর্থ যে কোনো নবি হলেও এখানে শব্দের শুরুতে ‘আলিফ-লাম’ থাকায় এর অর্থ হবে নির্দিষ্টভাবে আমাদের নবি। সুতরাং উভয়ের সমষ্টিতে অর্থ হলো, আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনী বা চরিত।

এর পাশাপাশি আমাদের সমাজে প্রচলিত আরেকটি শব্দ হলো, ‘মিলাদুন্নবি’। এটা ‘মিলাদ’ ও ‘আন-নবি’ শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। ‘মিলাদ’ অর্থ জন্ম, আর ‘আন-নবি’ অর্থ আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সুতরাং ‘মিলাদুন্নবি’ অর্থ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম।

সিরাতুন্নবি আর মিলাদুন্নবির মাঝে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য না জানার কারণে অনেকেই এ দুটিকে এক মনে করে। আবার অনেকে সিরাতুন্নবির বিপরীত মিলাদুন্নবিকেই মূল ভেবে থাকে। মূলত মিলাদুন্নবি হলো সিরাতুন্নবির একটি অংশ মাত্র। কারণ, মিলাদুন্নবি বলতে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শুধু জন্মবৃত্তান্তকেই বুঝিয়ে থাকে। এর বিপরীত সিরাতুন্নবি বলতে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমগ্র জীবনী তথা জন্ম, শৈশব, যৌবন, নবুওয়াত, হিজরত ও মৃত্যুকে বুঝায়। তাই সিরাতুন্নবিতে মিলাদুন্নবি পাওয়া যায়, কিন্তু মিলাদুন্নবিতে পূর্ণাঙ্গ সিরাতুন্নবি পাওয়া যায় না।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম আমাদের জন্য; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক মহাসৌভাগ্য ও আনন্দের বিষয়। কিন্তু এ জন্মকে কেন্দ্র করে আনন্দ উদযাপন করা, প্রতিবছর এ উপলক্ষে বিশাল শোভাযাত্রা ও মিষ্টি বিতরণ করা, পাশাপাশি এটাকে সকল ইদের শ্রেষ্ঠ ইদ নামকরণ করে দিবস পালন করা কতটুকু যৌক্তিক? আদৌ কি এটা ইসলাম সমর্থন করে? এর উত্তর জানতে হলে আমাদের কয়েকটি মূলনীতি জানতে হবে।

এক : ইসলাম অহিভিত্তিক এক জীবনব্যবস্থার নাম। তাই এতে কোনো একটি বিষয় অনুমোদিত হওয়া না হওয়া সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে অহির দুই উৎসমূল কুরআন ও সুন্নাহর অনুমোদন থাকা না থাকা ওপর। অনুমোদন থাকলে সেটা দ্বীন, অন্যথায় তা হবে দ্বীনের নামে দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন, যা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। যেমন সহিহ বুখারিতে আয়িশা রা.-এর বর্ণনায় এসেছে, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন :
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ، فَهُوَ رَدٌّ
‘যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনে নতুন কোনো বিষয় সংযোজন করবে তা প্রত্যাখ্যাত বলে বিবেচিত হবে।’ (সহিহুল বুখারি : ৩/১৮৪, হা. নং ২৬৯৭)

বাস্তবতা হলো, সমগ্র কুরআন ও সুন্নাহয় মৌখিক বা কর্মবিষয়ক এমন একটি দলিলও পাওয়া যায় না, যদ্বারা মিলাদুন্নবির প্রামাণ্যতা সাব্যস্ত হয়। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াতি জীবনে তেইশটি জন্মদিন গত হয়েছে, কিন্তু সহিহ তো দূরে থাক, কোনো দুর্বল বর্ণনায়ও আসেনি যে, তিনি প্রচলিত পদ্ধতিতে তাঁর জন্মদিন পালন করেছেন। তাই হাদিসের পরিভাষায় এটা দ্বীনের মধ্যে নতুন এক সংযোজন ও বিদআত, যা সম্পূর্ণরূপে পরিহারযোগ্য।

দুই : যেকোনো আমলের পদ্ধতিগত বিষয়ে সাহাবিদের কর্মপন্থাই চুড়ান্ত ও সঠিক বলে বিবেচিত। কারণ, সাহাবায়ে কিরাম হলেন উম্মতের সবচেয়ে নিষ্ঠাবান ও বিশ্বস্ত জামাআত, যাঁরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কাছ থেকে স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন এবং তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ও নির্দেশনা একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করেছেন। তাই তাঁদের উপেক্ষা করে কখনও সত্যের কাছে পৌঁছা যাবে না। বিশেষত খুলাফায়ে রাশিদিনের অনুসরণের ব্যাপারে হাদিসে কঠিনভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেমন সুনানে ইবনে মাজাহ’য় বিশুদ্ধ সনদে ইরবাজ বিন সারিয়া রা. থেকে বর্ণিত, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ،
‘অতএব, তোমরা আমার এবং আমার খুলাফায়ে রাশিদিনের আদর্শ অনুসরণ করো। তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরো।’ (সুনানু ইবনি মাজাহ : ১/১৫, হা. নং ৪২)

ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রিয় সাহাবায়ে কিরাম কোনোদিনও মিলাদুন্নবির নামে কোনো উৎসব পালন করেননি। অথচ তাঁরা ছোট থেকে ছোট, সামান্য থেকে সামান্য একটি সুন্নাত-মুসতাহাব আমলও ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তাঁদের নবিপ্রেম ছিলো জগদ্বিখ্যাত, যার বর্ণনা ইতিহাসের পাতায় ভরপুর। সুতরাং মিলাদুন্নবি পালন যদি সুন্নাত বা ন্যূনতম মুসতাহাবও হতো তাহলে তাঁদের চেয়ে অধিক মিলাদুন্নবি পালনকারী দুনিয়ার বুকে আর কেউ হতে পারত না।

তিন : ইসলামে কোনো বিষয়ে সংখ্যাগত বা পদ্ধতিগতভাবে কিছু নির্ধারিত থাকলে তাতে কিয়াস তথা অনুমান করে কোনো কিছু বাড়ানো বা কমানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আমাদের দেশে মিলাদুন্নবিকে ইদ বলে প্রচার করা হয়, শুধু তাই নয়; বরং এটাকে সকল ইদের শ্রেষ্ঠ ইদ বলে ঘোষণা করা হয়। অথচ ‘ইদ’ শব্দটি শরয়ি একটি পরিভাষা,যা যত্রতত্র ব্যবহার করার অবকাশ নেই। আর শরিয়তে ইদ তো কেবল দুটিই; এতে তৃতীয় কোনো ইদ নেই। কেননা, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতের উৎসবের জন্য দুটি ইদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমন সুনানে আবু দাউদে বিশুদ্ধ সনদে আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন :
قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا، فَقَالَ: مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ؟ قَالُوا: كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ
‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে দেখতে পেলেন, উৎসবের জন্য তাদের দুটি নির্দিষ্ট দিবস রয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ দুটি কী দিবস? তাঁরা উত্তরে বললেন, জাহিলিয়াতের যুগে পালিত বিশেষ দুটি দিবস। তখন তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন তথা ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহা দ্বারা এর বিকল্প নির্ধারণ করেছেন।’ (সুনানু আবি দাউদ : ১/২৯৫, হা. নং ১১৩৪)

সুতরাং যেখানে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং নিজে এ উম্মতের উৎসবের জন্য দুটি ইদ নির্ধারণ করেছেন, সেখানে মিলাদুন্নবির নামে তৃতীয় আরেকটি ইদ তৈরি করা কতবড় ধৃষ্টতার শামিল! এ তো স্পষ্ট শরিয়তের মধ্যে সংযোজেনের শামিল!!

চার : আল্লাহ তাআলা তাঁর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে দ্বীনকে যথাযথভাবে পূর্ণ করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনিত করলাম।’ (আল-মায়িদা : ৩)

এমতাবস্থায় মিলাদুন্নবি যদি ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত বা ন্যূনতম মুসতাহাবও হতো তাহলে প্রকারান্তরে একথাই বলা হয় যে, আল্লাহ তাআলা কুরআনে মিথ্যা বলেছেন বা তাঁর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যথাযথভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেননি। নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক!

আসলেই কি মিলাদুন্নবি পালনীয় কোনো বিষয়? আদৌ কি এতে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রেম-ভালোবাসা প্রকাশ পায়? বিবেকবান ব্যক্তি মাত্রই অনুধাবন করবে যে, মিলাদুন্নবি মূলত কোনো পালনীয় বিষয় নয়। কেননা, মিলাদুন্নবি বলতে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মকালীন ঘটনাবলীকেই বুঝানো হয়ে থাকে। এখন কারও পক্ষে কি এটা সম্ভব যে, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মকালীন সেসব ঘটনাবলীর পুনরাবৃত্তি ঘটাবে? কিংবা অন্য কারও বেলায় কি তাঁর জন্মের সময়ের মতো আলৌকিক বিষয়গুলো প্রকাশ পাবে? উত্তরে যদি না বলা হয়, তাহলে আমাদের পক্ষে মিলাদুন্নবি পালন করা কিভাবে সম্ভব? মূলত মিলাদুন্নবি পালন করার কোনো বিষয় নয়; তা কেবল আলোচনার বিষয়। অথচ ইসলাম শুধু আলোচনার বিষয় নয়; বরং আলোচনা করে তদানুসারে আমল করার জন্যই ইসলাম। এজন্যই ইসলাম মানুষকে সিরাতুন্নবির প্রতি আহবান করেছে, মিলাদুন্নবির প্রতি নয়।

এখন আমরা এটা বুঝার চেষ্টা করব যে, প্রচলিত পদ্ধতির মিলাদুন্নবি পালন না করে আমরা কেন সিরাতুন্নবি পালন করব? কয়েকটি কারণ তুলে ধরছি-

প্রথমত, সিরাতুন্নবির মধ্যে মিলাদুন্নবি পাওয়া যায় যায়, কিন্তু মিলাদুন্নবির মধ্যে পূর্ণ সিরাতুন্নবি পাওয়া যায় না। যেহেতু মিলাদুন্নবি শুধু নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মকালীন ঘটনাবলীকেই বলে। আর সিরাতুন্নবি বলতে তাঁর জন্ম, শৈবব, যৌবন, নবুওয়াত, হিজরত, মৃত্যু তথা তাঁর সমগ্র জীবনীকে বলে।

দ্বিতীয়ত, মিলাদুন্নবি থেকে মুসলিম উম্মাহর কিছু গ্রহণ করার নেই, এটা শুধুই আলোচনার বিষয়। যেহেতু তা সম্পূর্ণটাই ছিল কুদরতি, যার সাথে উম্মতের আমল তথা নাজাত পাওয়া না পাওয়ার কোনো সর্ম্পক নেই। পক্ষান্তরে সিরাতুন্নবি হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ, যা উম্মত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে পারে। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
‘অবশ্যই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহজাব : ২১)

তাই উম্মাহর সামগ্রিক জীবনে মিলাদুন্নবি নয়; বরং সিরাতুন্নবির প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, মিলাদুন্নবি পালনকারীদের দেখা যায়, তারা বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে খুব জাকজমকের সহিত শোভাযাত্রা বের করে, মিষ্টি বিতরণ করে, একস্থানে বসে কিছুক্ষণ নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মকালীন কিছু ঘটনা আলোচনা করে এবং যারা মিলাদুন্নবি পালন করে না তাদেরকে রিসালাতবিরোধী, সুন্নাহবিরোধী ও নবির দুশমন বলে অভিহিত করে থাকে। অথচ সারাবছর তাদের জীবনে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত পালনের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। এমনকি যারা নবির আশেক ও প্রেমিক বলে দাবি করে, তাদের অনেকের মুখে দাড়ি পর্যন্ত দেখা যায় না। এটাই কি নবিপ্রেমের নিদর্শন? মূলত প্রেমিকের সকল আদর্শ ও পছন্দ-অপছন্দ জেনে নিজেকে সে অনুযায়ী গড়ে তোলাকেই আসল প্রেম বলা হয়। বাস্তবজীবনে নববি আদশের্র প্রতিফলন না ঘটিয়ে শুধু মৌখিক প্রেমের দাবি করা কপটতা ও ধোকাবাজি বৈ কিছু নয়।

চতুর্থত, মিলাদুন্নবির জন্য ১২ই রবিউল আওয়াল যে দিন নির্ধারণ করা হয়েছে সেটা আদৌ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মদিন কিনা, তাতে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে, ইতিহাস পাঠকদের কাছে যা অজানা নয়। কেননা, এ ব্যাপারে অনেক মত পাওয়া যায়। কারও মতে ২রা রবিউল আওয়াল, কারও মতে ৮ই রবিউল আওয়াল, কারও মতে ৯ই রবিউল আওয়াল, কারও মতে ১০ই রবিউল আওয়াল, কারও মতে ১২ই রবিউল আওয়াল, আবার কারও মতে তাঁর জন্ম রবিউল আওয়ালে নয়; বরং সফর মাসে, কারও মতে রমজান মাসে। এ ধরনের আরও অনেক মত পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা যে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যুদিবস, তাতে উল্লেখযোগ্য তেমন মতানৈক্য নেই। বরং অধিকাংশ সিরাত বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদের মত হলো, তিনি ১২ই রবিউল আওয়ালে ইনতিকাল করেছেন। (দেখুন- ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার : ৮/১৩০, আস-সিরাতুন নববিয়্যা, ইবনু কাসির : ১/১৯৯, ৪/৫০৯, আর-রাওজুল উনুফ, সুহাইলি : ১/২৮২, ৪/৪৩৯-৪৪০, আর-রাহিকুল মাখতুম, মুবারকপুরি : পৃ. ৪১)

এখন এটা কেমন বিবেকের কথা যে, মহান কোনো ব্যক্তির নিশ্চিতপ্রায় মুত্যুদিবসকে জন্মদিন হওয়ার সম্ভাবনার ভিত্তিতে তাতে আনন্দ উদযাপন করা হবে! একইদিনে কারও জন্ম ও মৃত্যুদিবস নিশ্চিত হলেও তো বিবেকবান কোনো লোক সেদিনে আনন্দ উৎসব করতে পারে না। তাহলে ১২ই রবিউল আউয়ালে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম উপলক্ষে যে আনন্দ উৎসব করা হয় তা কতটা অযৌক্তিক হতে পারে, পাঠকগণ নিজেই চিন্তা করে দেখুন!

পঞ্চমত, নবিপ্রেম বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে সাহাবিদের নবিপ্রেমের স্বরূপ। কারণ, পৃথিবীতে সুস্থ বিবেকসম্পন্ন কারও পক্ষে এ দুঃসাহস দেখানো সম্ভব নয় যে, সাহাবায়ে কিরামের চেয়ে কেউ নিজেকে অধিক নবিপ্রেমিক দাবি করবে। সুতরাং মিলাদুন্নবি পালন করা যদি নবিপ্রেমের নিদর্শনই হতো তাহলে সাহাবায়ে কিরামের চেয়ে অধিক মিলাদ পালনকারী আর কেউ হতে পারত না। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবিযুগ ও তাঁর পরবর্তী সোনালী যুগে এ মিলাদন্নবির কোনো অস্তিত্ব ছিল না; বরং নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইনতিকালের ছয়শ বছর পর মুজাফফর কুকুবরি নামক এক শাসক প্রচলিত এ মিলাদুন্নবির প্রবর্তন করে। (দেখুন, আল-হাবি লিল-ফাতাওয়া : ১/১৮২, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ : ১/৩৬৫)

তাই এটাকে কখনও নবিপ্রেমের মাপকাঠি বানানোর সুযোগ নেই।

ষষ্ঠত, কারও যদি মিলাদুন্নবি পালনের এতই আগ্রহ থাকে, তাহলে তার জন্য প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীত বিশুদ্ধ একটি আমল আছে, যা সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। সেটা হলো, প্রতি সোমবার রোজা রাখা। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই তিনি শুকরিয়া স্বরূপ প্রতি সোমবারে রোজা রাখতেন। যেমন সুনানে তিরমিজিতে সহিহ সনদে আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন :
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَرَّى صَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَالخَمِيسِ
‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজার ব্যাপারে খুব খেয়াল রাখতেন ‘ (সুনানুত তিরমিজি : ২/১১৩, হা. নং ৭৪৫)

সহিহ মুসলিমে আবু কাতাদা রা.-এর বর্ণনায় এদিনে রোজা রাখার কারণও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন :
وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الِاثْنَيْنِ؟ قَالَ: «ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ – أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ
‘আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সোমবারে রোজা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এদিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এদিনেই আমার ওপর অহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহু মুসলিম : ২/৮১৯, হা. নং ১১৬২)

তথাকথিত আশেকে রাসুল যারা, তারা কিন্তু বিশুদ্ধ এ সুন্নাহর কথা জানেই না, আর কেউ জানলেও এর ওপর আমলের ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ, এটা তো কষ্ট ও মুজাহাদার সুন্নাত। বছরের বায়ান্নো সপ্তাহে বায়ান্নোটি রোজা রাখা তো এত সহজ নয়। এসব নামধারী আশেকে রাসুলরা তো কেবলই মিষ্টি সুন্নাত খুঁজে বেড়ায়; যদিও তা আদৌও সুন্নাত বলে প্রমাণিত না হোক, কিংবা উলামায়ে কিরাম তা বিদআত বলে আখ্যায়িত করুক। মূলত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ ও আদর্শ বাদ দিয়ে যারা নিজেদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টি খোঁজে, তারা হয় চরম অজ্ঞ নাহয় বন্ধুবেশি দুশমন।

শেষকথা হলো, ইসলামের প্রতিটি বিষয় কুরআন-সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত। কুরআন-সুন্নাহর বাহিরে কোনো কিছু দ্বীন হতে পারে না। শরিয়তকে বাদ দিয়ে শুধু মনগড়া যুক্তি দিয়ে বিচার করার কারণেই ইসলামে অসংখ্য বিদআতের উৎপত্তি হয়েছে। তাই আসুন, আমরা নিজেদের মনগড়া মতবাদ ছুড়ে ফেলে মিথ্যা নবিপ্রেম বাদ দিয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ ও নববি আদর্শ বাস্তবায়ন করে সত্যিকার নবিপ্রেমিক হওয়ার চেষ্টা করি। বছরের শুধু একদিন মিলাদুন্নবি পালন না করে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে সিরাতুন্নবি তথা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ লালন করার চেষ্টা করি। তাহলেই আমরা জোর গলায় বলতে পারব, আমরাই হলাম সত্যিকারার্থে আশেকে রাসুল, আমরাই সাচ্চা নবিপ্রেমিক।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হক বুঝার তাওফিক দান করুন এবং সিরাতে মুসতাকিমের ওপর অটল রাখুন।

Leave a Reply

Thanks for choosing to leave a comment.your email address will not be published. If you have anything to know then let us know. Please do not use keywords in the name field.Let's make a good and meaningful conversation.

2 × 1 =

error: Content is protected !!